ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্বে ওহী এবং এর উৎস ও মাধ্যম
ওহী (الوحي)
ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্বে বা মাসা-দিরুল মা’রিফা (مَصَادِرُ المَعْرِفَة)-এর আলোচনায় ওহী (الوحي) হলো জ্ঞানের সর্বোচ্চ এবং পরম উৎস। আরবি 'ওহী' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো অতি দ্রুত গোপন সংকেত দেওয়া বা কারো মনে কোনো বিষয় প্রবিষ্ট করা। পারিভাষিক অর্থে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্বাচিত নবী ও রাসূলদের কাছে যে বার্তা, বিধান বা জ্ঞান সরাসরি কিংবা ফেরেশতার মাধ্যমে প্রেরণ করেন, তাকেই ওহী বলা হয়। যেমন— পবিত্র কুরআন, হাদিসে কুদসী, সুন্নাহ, আদি আসমানী কিতাব এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির সত্য স্বপ্ন।
ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্ব ও ফিকহ শাস্ত্র অনুসারে ওহী মূলত চার ধরনের হতে পারে:-
-
الوحي
- الوحي المتلو
- الوحي غير المتلو
- الوحي الخفي
- الوحي النبوي
১. ওহীয়ে মাতলু (الوحي المتلو):
যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং যা সালাতে তিলাওয়াত করা হয়।
উদাহরণ: পবিত্র কুরআন।
২. ওহীয়ে গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو):
আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এমন জ্ঞান, যার অর্থ আল্লাহর কিন্তু শব্দগুলো নবী (সা.)-এর নিজস্ব ভাষায় প্রকাশিত। এটি তিলাওয়াত করা হয় না।
উদাহরণ: হাদিসে কুদসী।
৩. ওহীয়ে খফি (الوحي الخفي):
রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ বা বিধানসমূহ, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্তরে ইলহাম বা ওহীর মাধ্যমে প্রবিষ্ট করেছেন। এটি কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগিক রূপ।
উদাহরণ: সালাতের রাকাত সংখ্যা বা নিয়ম-কানুন সম্পর্কিত হাদিস।
৪. নবুয়তি ওহী (الوحي النبوي):
নবী-রাসূলগণের প্রতি প্রেরিত বিশেষ নির্দেশ বা বার্তা, যা সাধারণত স্বপ্ন বা সরাসরি অন্তরে সঞ্চারের মাধ্যমে প্রাপ্ত।
উদাহরণ: ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির স্বপ্ন বা রাসূল (সা.)-এর নবুয়তের শুরুতে দেখা সত্য স্বপ্ন।
ইসলামিক স্কলারদের দৃষ্টিতে, আসমানী কিতাবসমূহের আদি উৎস নিঃসন্দেহে ওহী ছিল। তবে ওহী হওয়ার শর্ত হলো তার বিশুদ্ধতা ও অখণ্ডতা। কালের পরিক্রমায় মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে যখনই সেই বাণী তার মূল ঐশী রূপ হারিয়ে ফেলেছে, তখনই তা আর ওহীর অকাট্য মানদণ্ড বহন করতে পারছে না। একারণেই কুরআন ব্যতীত অন্য কোনো আসমানী কিতাবকে বর্তমানে 'ওহী' হিসেবে দলিল পেশ করা ইসলামিক জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কাইফিয়্যাতুল ওহী (كيفية الوحي)- ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরা (আয়াত ৫১) অনুযায়ী ওহী মূলত তিনটি পদ্ধতিতে আসতে পারে-
-
كيفية الوحي
- الْإِلْقَاءُ
- مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
- إِرْسَالُ الرَّسُولِ
১. আল-ইলকা (الْإِلْقَاءُ - সরাসরি অন্তরে সঞ্চার):
আল্লাহ কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি হৃদয়ে জ্ঞানের স্ফুরণ ঘটান বা কোনো জ্ঞান ঢুকিয়ে দেন।
২. মিন ওয়ারাইল হিজাব (مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ - পর্দার আড়াল থেকে):
এখানে মাধ্যম হিসেবে কোনো ফেরেশতা থাকেন না, তবে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পর্দা থাকে।
যেমন— মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহ কথা বলেছিলেন।
৩. ইরসালুর রাসুল (إِرْسَالُ الرَّسُولِ - বার্তাবাহক প্রেরণ):
ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর কালাম বা বার্তা নবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছানো। যা অধিকাংশ ওহীর ক্ষেত্রে ঘটেছে।