ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্ব অনুসারে ইলমে ইকতিসাবি-এর পরিচিতি ও প্রয়োগ
ইকতিসাবি উলুম العلوم الاكتسابية)
ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে একটি ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি সেই জ্ঞান মানবতার কল্যাণে এবং স্রষ্টার সৃষ্টিজগতকে বোঝার উদ্দেশ্যে অর্জিত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার মানুষকে পৃথিবীতে বিচরণ করতে, আকাশ ও পৃথিবীর রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে এবং সৃষ্টিজগত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, পঞ্চইন্দ্রিয় বা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম।
ইসলামিক জ্ঞানতত্ত্বে (Islamic Epistemology) জ্ঞানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
-
জ্ঞান (العلم)
- ইলমে লাদুন্নি (علم لدني)
- ইলমে ইকতিসাবি (علم اكتسابي)
১. ইলমে লাদুন্নি (علم لدني):
এটি সরাসরি আল্লাহ প্রদত্ত বা ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান।
২. ইলমে ইকতিসাবি(علم اكتسابي):
মানুষ তার বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং পঞ্চইন্দ্রিয়ের ব্যবহারের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করে, তাকেই 'ইলমে ইকতিসাবি' বলা হয়.
'ইকতিসাবি' শব্দটি আরবি 'কাসব' (كسب) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ উপার্জন করা বা অর্জন করা। যেহেতু এই জ্ঞানটি সরাসরি ওহীর মাধ্যমে নাজিল হয় না, বরং মানুষ নিজ শ্রম, মেধা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা লাভ করে, তাই একে এই নামে আখ্যায়িত করা হয়। আধুনিক দর্শনের পরিভাষায় একে ‘অভিজ্ঞালব্ধ জ্ঞান’ (Empirical Knowledge)-ও বলা হয়।
ইকতিসাবি জ্ঞান অর্জনের তিনটি মূল ধাপ:
ইসলামি দার্শনিকগণ, বিশেষত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এবং ইবনে সিনা (রহ.) জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়ায় তিনটি বিশেষ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন
হাউয়াস(حواس):
এটি জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক উৎস বা পঞ্চইন্দ্রিয় (দেখা, শোনা, স্পর্শ করা, ঘ্রাণ ও স্বাদ নেওয়া)। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই আমরা বাইরের জগত থেকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করি।
তাজরিবা(تجربة):
এটি হলো অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা। পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার নামই তাজরিবা।
ফিকর (فكر):
ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য যখন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তা পরিপূর্ণ জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। চিন্তা বা 'ফিকর' হলো জ্ঞান অর্জনের সেই চূড়ান্ত পর্যায়, যা মানুষকে প্রকৃত সত্যের সন্ধান দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ইলমে ইকতিসাবি কেবল পার্থিব উন্নতির মাধ্যম নয়, বরং এটি পৃথিবীর বুকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে আমাদের অর্পিত দায়িত্ব পালনের প্রধান হাতিয়ার। যখন আমরা মহাবিশ্বের নিয়মগুলো গবেষণার মাধ্যমে আয়ত্ত করি এবং সেই জ্ঞান মানবতার কল্যাণে ও সৃষ্টির সেবায় ব্যবহার করি, তখন সেই প্রতিটি অনুসন্ধান এক একটি ইবাদত হয়ে ওঠে। তাই জ্ঞান অর্জনের এই পথে থাকা বা অনুশীলন করা একজন মুমিনের জন্য কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নয়, বরং এটি তার আধ্যাত্মিক যাত্রারই একটি অপরিহার্য অংশ। সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যবেক্ষণ এবং চিন্তার মাধ্যমে সত্যের পথে এগিয়ে চলাই একজন মুমিনের জ্ঞানচর্চার মূল লক্ষ্য।